Tuesday, 28 August 2012

সবাই যায় পশ্চিমে,আমি গেলাম পুবে ও পশ্চিমে (২)


প্রথম পর্ব পড়ে নিতে পারেন এখান থেকে।
সবাই যায় পশ্চিমে,আমি গেলাম পুবে ও পশ্চিমে (১)

ঘুম থেকে উঠলাম ঘণ্টা তিনেক পর,ততক্ষণে আমার সাথে থাকা ছেলেটি জুতা মুজা খুলে বসেছে আর টিভিতে দেখছে স্থানীয় সংবাদ। সংবাদের কি বুঝছে সে,সেই জানে। নক পেয়ে দরজা খুললাম,আরো একজন আমাদের সাথে এসে যোগ দিল। তার নাম আসিফ,আমাদের মধ্যে এক জুটি ছিল,তখন টের পেলাম। ছেলেটি মেয়েটিকে একান্তে পাবার লক্ষে তার রুম থেকে আসিফকে বের করে দিয়েছে।  আসিফ মন খারাপ করে বসে আছে। আমারও মনে খারাপ কারন দুই মেয়ে,একজন জুটিতে,রইল বাকি  মাত্র এক।

ছেলেরা একসাথ হলে সেখানে নারী শরীরের বর্ননাই সবচে গুরুত্বপূর্ণ এবং নিখুঁত। আসিফ বলল মেয়েটি ঠোঁটে লিপস্টিক লাগিয়ে রুমে ঢুকেছে,আমি আমার ঠোঁট দিয়ে লিপস্টিক চেটে খাবার ভঙ্গি করে দেখালাম,বাকি দুজন খুবই মজা পেল এবং বাহবা দিল।
দুই বিছানার মাঝখানে ইন্টারকম টেলিফোন। আংরেজি ছবিতে দেখেছি ফোন তুলে খাবার অর্ডার করলেই খাবার চলে আসে। আমিও ফোন তুলে নিলাম কানে, ডিরেকশন শুনে রুম সার্ভিস এর জন্য জন্য ১০৩ বা ১০৪ এই জাতীয় একটা ডিজিট প্রেস করলাম,মিনারেল পানি আর কফির অর্ডার করলাম,কারন আমাদের খাবারের ব্যবস্থা হোটেলের বুফেতে,অর্ডার দিয়ে খেলে পয়সা লাগবে। অতএব কফিই সই। নিজেকে আংরেজি ছবির নায়ক নায়ক মনে করতে লাগলাম।

হাতমুখ ধুতে ধুতে কফি চলে আসলো। আসিফ এবং রাফি বিভিন্ন গঠনমূলক বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে লাগলো। আমি কফি খেয়ে নেমে গেলাম নীচে,মেইল করতে।
মোস্তফা গেমস খেলার মতো বক্স কম্পুটার। ৩০ মিনিট পর পর স্বয়ংক্রিয়ভাবে নেট বিচ্ছন্ন হয়ে যায়। মেইল বক্সে আমাদের সাথের আরেক ছাত্র প্রত্যয় এর প্রেমিকার একটি মেইল পেলাম,রমণী প্রেমিকের জন্য খুব টেনশন করছে।

 পিতা মহাদয়কে মেইল দিলাম,যে হোটেলে আছি,কোন সমস্যা নাই। ফেসবুকে স্ট্যাটাস আপডেট দিলাম

- হ্যাভিং ফান উইথ ফ্রেন্ডযযয( এস নয় বরং ইংরেজি জেড দিয়ে লিখতে হবে) ইন আবুধাবী এয়ারপোর্ট হোটেল..... .
এই ধরনের স্ট্যাটাসকে বলা হয় চিল বা কুল আপডেট।  এখানে কয়েকটি বিষয় লক্ষনীয়। “ফ্রেন্ডয” লেখার মানে হোল আমার অনেক বন্ধু এবং সেখানে মেয়ে বন্ধুও আছে। দ্বিতীয় বিষয় লাইনের শেষে ডট ডট ডট...... অর্থাৎ ফান চলছে,এবং   ফান যেকোন দিকে টার্ন করতে পারে।

নিজেকে কুল ডুড প্রমান করে আমি এয়ারপোর্ট এর মধ্যের দোকান পাট ঘুরে দেখতে লাগলাম,ক্যামেরার দাম খুব কম,গয়না গাটিরও,চকলেটের। অনেক শেখ দেখলাম,ঢোলা আলখাল্লা পরে মাথায় পাগড়ী বেঁধে ঘুড়ে বেড়াচ্ছে। এছাড়াও নেপালের দুজন ছাত্রের সাথে পরিচয় হোল, তারা হোটেল বুক করেনি,তাই সারা রাত লবিতে বসে কাটাতে হবে,আমার সাথে খাতির জমাতে এলে আমি পাত্তাই দিলাম না,কারন তারা লবিতে রাত কাটাবে আর আমি হোটেলে। কিছু উপদেশ দিয়ে আমি সটকে পড়লাম। কারন নাপিত যখন মন্ত্রী হয়,তখন সে আর, নাপিত কি জিনিস চেনে না এবং চেনার চেষ্টাও করে না। এটাই স্বাভাবিক।

রাত আটটার দিকে ফিরে এলাম রুমে। গঠনমূলক আলোচনা তখনও চলছে,আমি তাদেরকে বললাম যে প্রত্যয় এর প্রেমিকা আমাকে মেইল করেছে,সবার চোখে সন্দিহান জিজ্ঞাসু। প্রত্যয়কে না করে আমাকে কেন? আমিও এক দাগ বেশি রহস্য চোখে নিয়ে বুঝিয়ে দিলাম আমাকে নয় তো কি তোমাদের মতো ফাতরাদের মেইল করবে? আমি সবাইকে বললাম যে এখন বুফেতে না গেলে মানুষের খেয়ে ফেলা উচ্ছিষ্ট খেতে হবে শেষে। সবাই তড়িঘড়ি করে তৈরি হয়ে গেল।

আমি নক করলাম মেয়েদের রুমে। বেড়িয়ে এল যে মেয়েটি সে বড়ই রূপবতী হয়েছে,ভেজা চুল,ঠোঁটে লিপগ্লস, কুসুম কুসুম রোমান্সের ইচ্ছা বাড়ি দিল মনে ভীষণভাবে। রাতে খেতে যাবার কথা বললাম,এবং কেয়ারিং হবার চেষ্টা করলাম। এটা সেটা জিজ্ঞাসা করলাম,কোন সমস্যা হয়েছে কিনা, শরীর কেমন,এসিতে তাপমাত্রা ঠিক মতো সেট করতে পেরেছে কিনা ইত্যাদি। আমি তাকে বুঝিয়ে দিলাম- ইফ সি নিডস এনিথিং,আই এম অলঅয়েজ দেয়ার,বাই হার সাইড।
জুটিকেও জানতে সাহায্য করলাম কোথায় বুফে,এবং কিভাবে যেতে হবে।

দলবল নিয়ে আমরা বুফেতে পৌঁছে গেলাম এবং বাঙ্গালীয়ানা বজায় রেখে টেবিলে এক্সট্রা চেয়ার যোগ করে সবাই একসাথে বসলাম। নাম বুফে হলেও ওয়েটার আছে এবং তার চেহারায় উপমহাদেশীয় ছাপ। ওয়েটার কাছে আসতেই মেয়েটি বলে উঠল “ টাকলা ওয়েটার” আমরা সবাই একচোট হেসে নিলাম। মেইন কোর্স অর্ডার করল যে যার পছন্দ মতো। তবে সবাই খুটিয়ে দেখে নিল পর্ক আছে কিনা,আমি সবাইকে নিশ্চিত করলাম যে আরব দেশের এয়ারপোর্ট হোটেলে পর্ক এবং এলকোহল থাকবে না এবং তার মধ্যে এখন রোজা চলছে।

শুয়োরের বিষয়টি দেশের বাইরে খুব গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয়। না খেয়ে মরে গেলেও শুয়োর ছোয়া চলবে না। শুয়োরকে যত গাল পাড়বেন আপনার উপর প্রবাসীরা তত খুশী হবে। এছাড়াও রাশিয়াতে আরব ছাত্রদের দেখেছি মদের সাথে খাবার জন্য গ্রাম থেকে হালাল ভেড়া অথবা গরুর মাংস কিনে আনতে,শুয়ার কখনই নয়। শুয়োর খাওয়া ইসলামে সরাসরি হারাম। আমরা অপেক্ষা করছি খাওয়া আসার,এর মধ্যেই আমাদের জুটি পৌঁছে গেল,আমাদের কোন রকম পাত্তা না দিয়ে তারা আলাদা টেবিলে বসে গেল এবং খুনসুটি করতে লাগলো।

খাবার আসার পর দেখ গেল কেউই খেতে পারছে না,কেউ কাটা চামচ চাকুর জন্য,কেউ লজ্জায়,কেউ ভাত- মাছ না পেয়ে। সবাই তখনও চামচে টুং টাং করছে আমি ওয়েটারকে ডেকে ডেসার্ট অর্ডার করলাম, ফ্রুট কেক চাইলাম।

কেক চলে আসার পর দেখা গেল উপরে অজানা এক ফলের টুকরো। আমি সম্ভ্রান্ত মুসলমানের ঘরের সন্তান,না জেনে কিভাবে খাই? যদি হারাম ফল হয়? আমি আমার ওয়েটারকে ডেকে জিজ্ঞাসা করলাম এই ফল কি ফল? সে জবাব দিল “কিভি” কিভি হোল বাংলাদেশে আমড়া সাইয ফল,ছিলে খেতে হয়,টক মিষ্টি স্বাদ। ভেতরের শাঁসের রং কাচা কলার মতো। আগ্রহীদের জন্য কিভি ফলের একটা ছবি দিয়েছি। পিচ ফল আর কিভি ফল এখনও আমার সবচে প্রিয় ফল।
কেক শেষ হবার পর আমি আইসক্রিম নিতে চাইলাম,ওয়েটার বলল
- স্যার ইউ হ্যাভ অলরেডী অর্ডারড ইয়োর ডেসার্ট,ইউ ক্যান নট অর্ডার এগেন।

ইজ্জতের পায়জামা খুলে গাছে ঝুলিয়ে দিয়ে গেল ব্যাটা। জুমার নামাজের দুই রাকাত ফরজ নামাযের জামাতের পর আপনি মসজিদে প্রবেশ করলে আপনার দিকে মানুষ যেভাবে তাকিয়ে থাকে,সবাই আমার দিকে সেইভাবে তাকিয়ে রইল।
আমি হেসে উড়িয়ে দেবার চেষ্টা করলাম কিন্তু বিষয়টা ঠিক উড়ল না।

পেটপূজা সেরে আমরা রুমে ফিরে আসলাম। সবাই আমার রুমে বসল,বিভিন্ন গল্প গুজব করছি,কে কিভাবে এপ্লাই করেছে,কার বাড়ি কই,ভাই বোন কতজন,কে কয়টা প্রেম করেছে ইত্যাদি। আমি হাই তুলে বললাম- এক প্যাকেট তাস নিয়ে আসা উচিত ছিল,২৯ খেলা যেত,সবাই আমার দিকে এমনভাবে তাকালো যেন আমি সবাইকে হেমলক বিষ খেতে বলেছি।

মেয়েটি বিদায় নিল,তার নাকি ঘুম আসছে। এরপর আমি প্রস্তাব দিলাম সবাইকে,নীচে যাওয়া যাক,অনেক নারী যাত্রী আছে,পরিচিত হওয়া যাক,কথা বলা যাক আফটার অল দেয়ার ইজ আ থিং কল্ড “ ওয়ান নাইট স্ট্যান্ড” কিন্তু সবার অনাগ্রহ দেখে মনে হোল আমি একদল সমকামীর মাঝে এসে পড়েছি।

একজন প্রস্তাব দিল গানের কলি খেলা যায়। আমি একটা সিধান্তে পৌঁছে গেলাম,হয় আমি ভিন গ্রহের বাসিন্দা,নয়ত এরা ভিন্ন গ্রহের বাসিন্দা।
সহসা রুমের ফোন বেজে উঠল,সবাই একযোগে আমার দিকে তাকালো। আমি উঠে গিয়ে ফোন ধরলাম। আমাকে জিজ্ঞাসা করা হোল কেউ রোজা রাখবে কিনা? তাহলে ভোররাতে ঘুম ভাঙ্গিয়ে দেয়া হবে ফোন করে,এবং খাবারের ব্যবস্থা আছে। আমি বললাম অবশ্যই,আমরা সবাই রোজদার।

ফোন রাখার পর সবাই জিজ্ঞাসা করল আমি কেন হ্যাঁ বললাম,আমি তো গতকালও রোজা ছিলাম না,তাছাড়া,আমরা কোথায় ইফতারী করব? মস্কো পৌঁছে আমাদের ইফতারের ব্যবস্থা কে করবে?
আমি সোজা সাপটা বলে দিলাম যে আমাদের প্রিয় নবীজী( দঃ) সবসময় সেহরী খেয়েছেন,এবং সাহাবীদের সেহরী খাবার জন্য উৎসাহিত করেছেন,আমি সেহরী এবং ইফতার ছেড়ে দিয়ে পাপের ভাগীদার হতে চাইনা।

এরপর যে যার রুমে চলে গেল,সিধান্ত হোল,যার ইচ্ছা সে খাবে,যার ইচ্ছা না সে সেহরী খেতে যাবে না।
( চলবে)

Sunday, 26 August 2012

সবাই যায় পশ্চিমে,আমি গেলাম পুবে ও পশ্চিমে (১)


আজ আমার প্রবাস জীবনের ৩ বছর পার হয়ে যাচ্ছে। ২০০৯ সালের এই দিনে বাক্স পেটরা নিয়ে হাজির হয়েছিলাম তৎকালীন জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। আমার মা হাপুস নয়নে কান্না কাটি করছিলেন,সাথে যোগ্য সঙ্গ দিচ্ছেন আমার বড় ফুপি। আমি দুজনের কাছ থেকে একটু আড়ালে থাকছি,কারন কান্না বিষয়টা বমির মতো,দেখলেই পেয়ে যায়।

পকেটে কিছু বাংলাদেশী টাকা ছিল, ভাগ করে দিয়ে দিলাম আমার ছোট ভাইকে আর ফুপাতো ভাইকে। আমার বাবা আমাকে বিভিন্ন উপদেশ দিতে লাগলেন। কিভাবে সাথে থাকা ডলার এবং সুটকেস নিরাপদে রাখতে হবে,বিপদে পড়লে কি করতে হবে,সুটকেস মিসিং হয়ে গেলে কি করতে হবে এইসব।

আমার সাথে আরো যাচ্ছে ৬ জন সরকারী স্কলারশীপ প্রাপ্ত ছাত্র এবং দুইজন ছাত্রী। সবাই বেশ কান্নাকাটি করছে,একজনের দেখলাম প্রেমিকাও এসেছে। সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চেক ইনে দাঁড়ালাম। একজন ছাত্রী আমার সাথে পরিচত হবার চেষ্টা করল,নাম ধাম, বাড়ি কোথায় ইত্যাদি। আমি সযত্নে উত্তর করে এড়িয়ে গেলাম,কারন সামনে দীর্ঘ পথ,আবু ধাবী তারপর মস্কো। অতিরিক্ত খাতিরের ফলাফলে আমার ঘাড়ে তার বাক্স পেটরা উঠিয়ে দেবার সম্ভাবনাই ৯০ ভাগ। অতএব যাত্রাপথে আমি কুসুম কুসুম রোমান্সের আশা পরিত্যাগ করলাম।

সেই রমণী আর আমি এখন একই শহরে পড়াশুনা করি,আশা করি রমণীর চোখে এ লেখাও পড়বে,এবং রমনী এই অধম রমনকে মাফ করিয়া দেবে।

বাক্স পেটরা প্লেন কোম্পানীকে গছিয়ে দিয়ে ইমিগ্রেশনের লাইনে গিয়ে দাঁড়ালাম। আমার সামনে সুইডেন গামী একদল শ্রমিক ভাই,তাদের গায়ে একই রঙের গেঞ্জি,মাথায় একই রঙের ক্যাপ। জিজ্ঞাসা করে জানতে পারলাম,তারা একই কোম্পানীতে চাকরী করতে যাচ্ছে। ইমিগ্রেশনে যাতে ঝামেলা না হয় এই জন্য ট্র্যাভেল এজেন্সি থেকে এই কাপড় পরিয়ে দিয়েছে,আরো জানতে পারলাম ভিসা লাগাতে ৫ লাখ টাকা নিয়েছে মাথা পিছু। শ্রমিক ভাইদের বিদায়ের পর আমার পালা।

ডেস্কে বসা পুলিশ আমাকে অনেক কিছু জিজ্ঞাসা করল,মস্কো যাচ্ছি শুনে তার পরিচিত এক আত্মীয়ের নাম এবং ফোন নাম্বার আমাকে লিখে দিল। আমিও বিনয় প্রদর্শনে কার্পন্য করিনি একফোটা। বাত-চিত শেষে আমার পাসপোর্ট মিলিয়ে দেখার পালা,কম্পুটারে নাম্বার ঢুকাতেই বিদ্যুৎ চলে গেল,মেজাজ গরম করে অফিসার আমাকে সিল ছাপ্পড় মেরে দিল কারন ব্যাক আপ জেনারেটর চালু হতে হতে ৩ মিনিট লাগে,আর সিস্টেম রিস্টোর হতে আরও ৪-৫ মিনিট। এত দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করার মতো বাজে সময় অফিসারের হাতে নেই। আমি মনে মনে ভাবলাম বাহ! আমি যদি আজ সাজাপ্রাপ্ত ফেরারী আসামীও হতাম,পার হয়ে যেতাম নিশ্চিন্তে।

এয়ারপোর্টের ভিতরে কিছু খাবারের দোকান আছে,সেখানে ১০ টাকা দামের মাম পানির বোতলের দাম ৭০ টাকা, বনরুটি সাইয বার্গারের দাম ৩৬০ টাকা,রোল পরোটা ৩৫০ টাকা ইত্যাদি।
আমি জীবনে প্রথমবারের মতো ডিউটি ফ্রি মার্কেট দর্শন করে ভীষণ হতাশ হলাম। কুকুরের পেটে ঘি সয় না,আর গরীবের গায়ে এসি সয় না। ভিতরের শীতল বাতাসে আমার ভীষণ শীত শীত করতে লাগলো। বসার জন্য সুন্দর জায়গা আছে,সেখানে নানা কিসিমের মানুষের ভিড়,বেশির ভাগই শ্রমিক ভাইয়েরা। আর একটু উচু দরের যাত্রীরা নিজেদের আলাদা বলয় সৃষ্টি করেছে, সেখানে তারা নিজেদের মধ্যে গল্প গুজব করছে,বেশির ভাগ কথাই বলছে ইংরেজিতে, যেখানে আটকে যাচ্ছে সেখানে বাংলা।

উড়োজাহাজের পেটে চাপিয়া বসিলাম। একপাশে এক মস্কোগামী এক ছাত্র অন্যপাশে অপরিচিত এক ভদ্রলোক,বাইরে গুড়ি গুড়ি বৃস্টি,মনের মধ্যেও গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি। মায়ের সাথে কথা বলছিলাম সেল ফোনে। অসম্ভব রূপবতী এক রমনী এসে বলল
- স্যার প্লিজ টার্ন অফ ইউর ইলেকট্রনিক ডিভাইসেস।
ভাগ্যিস স্কুল কলেজে ১২ বছর আংরেজি শিখেছিলাম নয়ত যাত্রাপথে বহু সমস্যা হয়। গোঁদের উপর বিষফোঁড়া,তখন চলছিল রোজা। প্লেনের অধিকাংশ যাত্রী ওমরা হজ করতে যাচ্ছে। আমার ধারনা ছিল শুধু মাননীয় সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াই ওমরা হজ করেন,বিশাল হজ বহর দেখে ভুল ভাঙল।

উড়োজাহাজ আকাশে ডানা মেলার সাথে সাথে যাত্রীদের খচর মচর শুরু হয়ে গেল,বোম্বে চানাচুর,বন রুটি,কলা কিছুই বাদ থাকলো না। এবং খাবার পর অনায়াসে প্যাকেটগুলো ঝড়ে পড়তে লাগলো প্লেনের মেঝেতে।

আমি সোজা বোতাম টিপে ভদকা আর কোকের অর্ডার করলাম,ফ্রি প্রিমিয়াম এলকোহল যতদূর কনজিউম করা যায় ততখানিই লাভ,এই ছিল দর্শন। বাঙ্গালী ফ্রি পেলে শাদা লুঙ্গিতে আলকাতরা তুলে নেয় আর সেখানে এলকোহোল। কোথায় আগরতলা কোথায় খাটের তলা।

পাশের যাত্রীরা আমার দিকে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইল। এসব চক্ষু উপেক্ষা করা প্রথমে প্রথমে একটু কষ্টকর।
ঘণ্টা খানেক পর এক ওমরা যাত্রী এয়ার হোস্টেসকে ডেকে নিয়ে হজ এর শানে-নুজুল,সওয়াব ইত্যাদি বুঝিয়ে বলছিলেন। রমনীর গরু চোখ দেখে আমার পেটের মধ্যে হাসি গড়িয়ে গেল,এক অক্ষর বুঝতে পারছিল না রমণী। নিজের ইংরেজি দক্ষতার প্রদর্শনী দেখিয়ে আমি অনুবাদ করে দিলাম মূল অংশ।

এরপর খাবার পালা,সাটিয়ে বসলাম তাছাড়া আমার মৃদু এলকোহলের পর খাবার রুচি বাড়ে। যা খাবার দিল,সেই রকম খাবার তিন বার চালালেও আমার পেটের আধা ভরবে না।
খাবার পর চা/ কফির আয়োজন। আমি এসব ছেড়ে রেড ওয়াইন চেয়ে বসলাম। আমার কাণ্ড কারখানায় সাথে ছাত্র ছাত্রীরা খুবই বিরক্ত,পারলে প্লেন থেকে নেমে পরের প্লেনে আসে এমন অবস্থা। অথবা ফোন করে আমার বাপের কাছে নালিশ দেয়।

দামী বিমান বলে কথা, সেখানে মিউজিক শোনা এবং মুভি দেখার বিশেষ ব্যবস্থা রয়েছে। ছাত্রদের মধ্যে দুইএকজন কানে হেডফোন লাগিয়ে রক মিউজিক শুনতে লাগলো এবং মাথা সামনে পেছনে দোলাতে লাগলো। এই গান শোনা পার্টি আমার খুবই বিরক্ত লাগে,আমি বিশ্বাস করি কণ্ঠ আছে অতএব গান শুনলে নিজের গলায়। এদের কাজ কারবার দেখলে মনে হয় মায়ের পেট থেকে পড়েই রক মিউজিক শোনা শুরু করেছে,ওয়াইন শেষ করে আমি কম্বল মুড়ি দিয়ে ঘুমাতে নিলাম তখন দেখি মুসুল্লী পার্টী প্লেনের খাবার প্যাকেটে ভরছে,কারন তারা রোজা। এই নাহয় বাঙ্গালী,নামে যেমন কাজেও তেমন।

৬ ঘণ্টা ওড়ার পর নামার সময় হয়ে এল,নামার সময় তলপেটে অদ্ভুত এক চাপ অনুভুত হয়,যেই সেই না একদম বেশ ভালো একটা চাপ। সহিহ সালামতে নেমে আসলাম আবুধাবী বিমান বন্দরে। চারদিকে যতদূর চোখ যায় শুধু বালি আর বালি।

আবু ধাবীতে আমাদের ২৩ ঘন্টার যাত্রাবিরতি। চেকিং এর আনুষ্ঠানিকতা সেরে পৌঁছে গেলাম বিমান অফিসের ডেস্কে। উল্লেখ্য এই যে, সব জায়গায় কথা বার্তা আমিই চালিয়েছি,হাজার হোক গত ৫ বছরের আংরেজি মিডিয়ামে পড়বার অভিজ্ঞতা বলে কথা। তবে ইদানীং ফেশবুকে যেভাবে ইংরেজি চর্চা হচ্ছে তাতে মাঝে মাঝে বড় দোটানায় পড়ে যাই। আসলে কোনটা সহি আংরেজি? যেটা স্কুল কলেজে শিখেছি নাকি যেটা কুল ডুডসরা লেখে সেটা?

এয়ারপোর্ট হোটেলের কার্ড নিয়ে হোটেল রুমে চলে এলাম,সেখানে এক রাত থাকার আয়োজন এবং ৪ বেলা খাবার আয়োজন করা হয়েছে। চাবি ছাড়া তালা দেখলাম সেই প্রথম,খোপের মধ্যে কার্ড ভরে দিলে দরজা খুলে যাচ্ছে,আহা সে যেন জাদুর বাক্স। ভিতরে আর একটা স্লট,সেখানে কার্ড সেট করলে বিদ্যুৎ সংযোগ। চমৎকার সাধু। অর্থাৎ কেউ রুম থেকে বেড়িয়ে গেলে বিদ্যুৎ অপচয় হবার কোন সম্ভাবনা নেই। সরকারী অফিস আদালতে এই সিস্টেম করলেও পারে।
এছাড়াও রুমে ঢুকেই এসির রিমোট হাতে নিয়ে একটা নাতিশীতোষ্ণ টেমপেরেচার সেট করে বাকি সবাইকে দেখিয়ে দিলাম যে আমি নিতান্ত ফেলনা নই। প্রতি রুমে দুইজন করে মোট ৪ রুম দেয়া হোল আমাদের।

আমার সাথের ছেলেটা একটু আড়ষ্ট বোধ করতে লাগলো,সে বিছানায় চুপচাপ বসে রইল। আমি তার সামনেই কাপড় চোপড় খুলে গোসল করতে ঢুকে গেলাম,তার চক্ষু কপালে,অবশ্য আমার দোষ না,আমার হ্যান্ড লাগেজে কোন কাপড় ছিল না। আমি নিরুপায়। বাথটবে ঘণ্টা খানেক দাপাদাপি করে ফিরে এসে দেখি ছেলেটা সেই একই জায়গায় চুপচাপ বসে আছে। বললাম গোসল করতে যেতে,না বোধক মাথা নাড়ল সে। আমি চুপচাপ টিভি ছাড়লাম,বোরিং আরাবিক চ্যানেল দেখতে দেখতে ঘুমিয়ে গেলাম।
( চলবে)

Wednesday, 22 August 2012

বাঁচুক সবাই মানুষ হয়ে


সদরঘাট,ঢাকা

সকালে ঘুম থেকে জেগেই কোন কাজ না করার সিধান্ত পাকা করে ফেলল মহসিন। আশে পাশে কেউ নেই,আগোছালো কাঁথা,বালিশ স্তূপ হয়ে রয়েছে। মহসিনের পাশে যারা ঘুমায় তারা বেশিরভাগই রিক্সা চালায়,সাত সকালে উঠেই কাজে চলে যায়। ঢাকা শহরে মনে হয় কম খরচে এর থেকে ভালো ঘুমানোর ব্যবস্থা আর নেই। বুড়িগঙ্গা নদীর উপর কাঠের লম্বা ঘর,উপরে টিনের চালা,রাত প্রতি ২০ টাকা,কাঁথা বালিশ বিছানোই থাকে,টাকা দিয়ে ঢুকে শুয়ে পড়লেই হয়। তবে মালিক গত মাসে বলে গিয়েছে আগামী মাস থেকে ৩০ টাকা রেট। আপাতত এ নিয়ে ভাবছে না মহসিন।

মোট তিন রকমের কাজ করে মহসিন,সপ্তাহে তিন দিন ময়লার গাড়ি নিয়ে ময়লা সংগ্রহ করে বাড়ি বাড়ি,বাকি তিন দিন ভ্যানে সবজিবিক্রেতা কমলের সাথে সবজি বিক্রি করে,আর বাকি একদিন কিছুই করে না,ঘুরে বেড়ায়। ইচ্ছে হলে রাতে রাতে স্বর্ণকারদের দোকানের পাশের ড্রেন থেকে ময়লা তুলে এনে পানিতে পরিষ্কার করে। মাঝে মাঝে সেই ময়লার মাঝেও মেলে এক দুই দানা সোনা, দিনে সেই একদানা সোনা আবার স্বর্ণকারদের কাছেই বিক্রি করে। তবে রাতে সোনার দানা পাবার সম্ভবনা খুব কম থাকে,কারন দোকানের ময়লা ফেলা হয় বিকেলে,সন্ধ্যার পর ময়লা ফেললে নাকি অমঙ্গল হয় ব্যবসার। যেদিন এক দুই দানা সোনা মেলে সেদিন একটু ভালো যায় মহসিনের,২০০-৩০০ কাঁচা টাকা আসে পকেটে,সেই সব দিন গুলোতে সিনেমা দেখতে যায় মহসিন,সন্ধ্যার শো। সিনেমা দেখে বের হয়ে একটা কুলফি মালাইও খায়। মালাই চাটতে চাটতে লোকাল বাসে করে ফিরে আসে বুড়িগঙ্গার পাড়ে।

 তবে কয়লা দিয়ে ভালো ছবি আঁকতে পারে মহসিন,খয়েরি রঙের কাগজের উপর একবার একটা ছবি একেছিল সে,প্রিয় নায়িকা শাবনুরের ছবি। সেই ছবি লুকিয়ে রেখেছিল বেগুনের ঝুড়ির নীচে। বেগুন কিনতে এসে এক রমণী সেই ছবি দেখে ফেলে,বাধ্য হয়ে স্বীকার করতে হয় মহসিনের যে ছবিটি তারই আকা

আসমানী- এই ছেলে,এই ছবি তুমি এঁকেছ?
মহসিন- জি আফা।
- তুমি সবসময় ছবি আঁক?
- জি না আফা।
- একটা ছবি দিলে দেখে আঁকতে পারবে?
- কার ছবি আফা?
- আমার একজন প্রিয় মানুষের।
- পারমু আফা।

আসমানী তাকে সুদর্শন এক রমনের ছবি ধরিয়ে দিল। সাথে দিল ৩৫০ টাকা। ছবি আঁকতে হবে কাপড়ের উপর,যেই সেই কাপড় না,মোটা কাপড়ের উপরে। এই ছবি প্রিয় মানুষকে উপহার দেবে আসমানী। মোটা কাপড় কিনে বুড়িগঙ্গার সেই চালা ঘরে ছবি আঁকতে বসেছিল মহসিন। রাতে তাকে ঘিরে ভিড় জমে গিয়েছিল,একজন এক কাপ চাও এনে দিয়েছিল,কয়েকজন বিড়ি নিয়ে বসে গিয়েছিল গল্প করতে, একজন বলেছিল একটা ন্যাংটা মেয়ের ছবি আঁকতে,বাকিরা তাতে সায়ও দিয়েছিল।

তিনদিন পর ছবি নিয়ে গিয়েছিল মহসিন। ছবি আর কাপড় কেনার পর বাকি ৯০ টাকা ফেরত দিয়েছিল আসমানীকে। আসমানী মিষ্টি হেসে তাকে আরো ৩০০ টাকা ধরিয়ে দিয়েছে উপহার হিসাবে। সেদিন শাকিব খান-অপু বিশ্বাস এর একটা ছবি দেখেছিল মহসিন,ছবির পর এক হোটেলে ঢুকেছিল নান রুটি আর সবজি খেতে,হোটেল থেকে বের করে দিয়েছিল মহসিনকে,ময়লা কাপড়ে নাকি এসব জায়গায় ঢোকা যায়না।

পড়াশুনা করতে পারেনি সেই অর্থে মহসিন, সিডরে সব ভেসে যাবার পর ভাগ্য ফেরানোর লক্ষ্য নিয়ে ঢাকায় এসেছিল,ভাগ্য তো ফেরেনি,বেড়েছে দুর্দশা,কখনও এক পেট খেয়েছিল,কখনও আধাপেটা,পার্কে ঘুমিয়েছে,রেল স্টেশনে,হিরোইন খোর সন্দেহে একবার জেলেও ছিল একরাত। জীবন যেখানে যেমন। তবে আক্ষেপ নেই মহসিনের। সবাই যদি গাড়ি ঘোড়া চড়তে শুরু করে,সবাই যদি শিক্ষিত হয়ে যায়,সবাই যদি ভদ্দরলোক হয়ে যায় তখন তো আর দুনিয়া চলবে না। তাছাড়া সবাই ভদ্দরলোক নাকি,ভদ্দরলোক নামী বহু খারাপ মানুষও আছে,শার্ট প্যান্ট পরা অনেকেই তো সদরঘাট আসে হেরোইন কিনতে,কত বিবাহিত ভদ্দরলোকের আছে আলু-পিয়াজের দোষ। এর থেকে মহসিনের ময়লা মাখানো জীবনটা বহু ভালো আছে। ময়লার মধ্যে থেকেও,ময়লা ঘেটেও মনটা রেখেছে পরিষ্কার। আলু-পিয়াজের দোষও নেই,নেই কোন মাদকাসক্তি।

শার্ট চাপিয়ে রাস্তায় বের হয়ে এল মহসিন। রাস্তার কলের পানিতে হাতমুখ ধুয়ে নিল,বড় রাস্তায় উঠে বাম দিকের বাড়িতে একটা প্লাকার্ড দেখতে পেল মহসিন,সেখানে লেখা “ আজ শুভর জন্মদিন”  নিজের জন্মদিন কবে মনে করতে পারলো না মহসিন,স্কুলে ভর্তি হবার সময় মাস্টার মাকে জিজ্ঞাসা করেছিল “ মহসিনের জন্ম তারিখ কবে?”
মা হেসে উত্তর দিয়েছিলেন “ মাস্টার সাব,তারিখ তো মনে নাই,তয় তালের সময় হইছিল মহসিন”
মাস্টার বাধ্য হয়ে মনমতো একটা জন্মতারিখ বসিয়ে দিয়েছিলেন। ঝামেলার কথা হোল সেই মনগড়া তারিখটাও মহসিনের মনে নেই। হুট করে আরো একটা সিধান্ত নিয়ে নিল মহসিন,আজই তার জন্মদিন। আজই সে পালন করবে জন্মদিন।

মোড়ের হোটেলে ঢুকেই,সুপ,পরাটা আর চায়ের অর্ডার করল মহসিন,জন্মদিনে ভালো মন্দ না খেলে উপরঅলাও রাগ করবেন। খাওয়া শেষ করে পাশের স্টেশনারী দোকানে ঢুকলো
- ভাই কেক আছে?
- কেমন কেক?
- গায়ে মেখে গোসল করার কেক
- ফাইজলামী করিস?
- তাইলে কেক আবার কেমন হয়? খাওয়ারই তো হয় নাকি?
-কয় পিস?
- এক পিস
- ১০ টাকা দে।

 কেক মুখে দিয়ে নিজের জন্মদিন পালন করল মহসিন,বিচ্ছিরি কেক,সস্তার তিন অবস্থা,চিনি আর ডালডা, দুনিয়াটা ভেজালে ভরে গেল ভাবতে ভাবতে কেক ছুঁড়ে ফেলে দেয় মহসিন। জন্মদিনে যদি একটুকরো কেকই না খাওয়া গেল।

একটা ফোন ফ্লেক্সীলোড এর দোকানে ঢোকে মহসিন,কাউকে ফোন করে জেনে নিতে হবে কোথায় আছে ভালো কেক,একপিস কেক না খেলেই নয়।
ফোন সামনে নিয়ে বসে আছে এক তালপাতার সেপাই,এর মধ্যে আবার সে খানদাণী গোফ রেখেছে,দেখেই হাসি পেয়ে গেল মহসিনের। ¬
- একটা ফোন করবার চাই।
- কাকে?
- আপনার বউরে
- বেয়াদ্দপের বাচ্চা,থাপড়াইয়া কানসা লাল করে দিমু।
- আপনেই তো জিজ্ঞাসা করলেন,আপনার কি দরকার আমি কারে ফোন করি? কথা কমু পয়সা দিমু।
- নে ফকিরনীর বাচ্চা

মোবাইলটা বেশ বাহারী। উপরে আবার প্লাসটিকের কাভার লাগানো। কাভারটা এই মোটা, যেন মোবাইলের গায়েও রাশিয়ার বরফ ঠাণ্ডা লাগে। মোবাইলের গায়ে আবার শেকল বাধা,শেকলের আরেক মাথা বাধা দোকানদারের টেবিলের সাথে। কিন্তু এখন ঝামেলা হোল,কারো মোবাইল নাম্বারই সে জানে না। কাকে ফোন করবে সে মহসিন? মনে পড়ল আসমানী তাকে একটা কাগজে করে নাম্বার দিয়েছিল,মানিব্যাগ হাতড়ে কাগজটা বের করল,নাম্বার লিখে ফোন করল
- হ্যালো
- হ্যালো আফা সালাম
- কে বলছেন?
- আফা আমি মহসিন
- সবজি মহসিন?
- জি আফা
-কেমন আছো? কোথা থেকে ফোন করেছ?
- আফা সদর ঘাট, আমি এইখানেই থাকি।
- আমাদের এখানে কবে আসবে সবজি বেচতে?
- পরশু,আফা আজকে আমার জন্মদিন,এক পিস কেক খাইতে ইচ্ছে করতেছে,কম দামে কই পামু?
- ওমা,তাই নাকি? তুমি চলে এসো আমাদের এলাকায়,এখানে এসে ফোন দাও,আমি নিয়ে যাবো তোমাকে দোকানে,আজকে আমি তোমাকে খাওয়াবো।
- না থাক,আফা,ঝামেলা করনের দরকার নাই,আমি খুজে নিবনে। আপনি খালি বলেন
- আরে ধুর চলে আসো। আমি বলেছি না আসতে।
- আচ্ছা ঠিকাছে আফা
- কিন্তু কিভাবে আসবে? আজকে তো হরতাল।
- কি যে বলেন আফা,এইডা কোন ঘটনা? আমি একটা ব্যবস্থা করে চলে আসবো।
- আচ্ছা তাহলে।

ফোনের বিল মিটিয়ে বের হয়ে আসে মহসিন,একটা রিক্সা করে লালবাগ এর মোড়ে এসে নামলো। এখান থেকে অন্য রিক্সা নিতে হবে,রাস্তা ঘাট একদম ফাঁকা, রিক্সা ছাড়া আর কোন যানবাহন নেই। হাঁটতে হাঁটতে রিক্সা খোজার সিধান্ত নেয় মহসিন।

 সামনে মিছিল দেখা যাচ্ছে,রাস্তার একদম পাশ ঘেঁটে হাটতে থাকে মহসিন,মিছিলের ক্যাচালে পড়বার কোন ইচ্ছা তার নাই, বিপরীত দিকে পুলিশ ব্যারিকেড দিয়েছে,মিছিলের মধ্যে বিদ্রোহের দানা গুটি বাধলো,উৎসাহী কয়েকজন পিছনে টায়ারে পেট্রোল ঢেলে আগুন জ্বালিয়েছে,একদম বলা নেই কওয়া নেই কয়েকজন ইট ছুড়তে লাগলো,পুলিশ প্রথমে কাদুনে গ্যাসের শেল ছুড়ল,শেল ফাটলো মহসিনের ঠিক পাশে,প্রচণ্ড ধোয়াতে চোখ জ্বলতে লাগলো মহসিনের,এর পর রাবার বুলেট,ছিঁড়ে যেতে চাইল মহসিনের পা,ধোয়াতে কিছুই ঠাওর করে উঠতে পারল না মহসিন,তবে অনুভব করল গরম পানির স্রোত বইছে পা থেকে নীচে।

 শরীর অবশ হয়ে আসতে লাগলো মহসিনের,কিন্তু না এখানেই যদি থেমে যায় মহসিন,হাজারো পায়ের নীচে চাপা পরে মৃত্যু হবে মহসিনের। আহত পা টেনে হিঁচড়ে নিয়ে আরো সামনে এগিয়ে গেল মহসিন,সেখানে দুটো দোকান দেখা যাচ্ছে। দুটো দোকানের ফাঁকে নিজেকে লুকিয়ে ফেলল মহসিন। একটু জিরিয়ে নিয়ে সামনে বাড়তে হবে,ধরা পরা যাবে না পুলিশের হাতে,ধরা পড়লে জেলে চালান করে দেবে,বলবে এরাই মিছিল থেকে বোমা ফাটিয়েছে।
সব কিছু ভেঙে পড়তে থাকে মহসিনের,চোখের সামনে ভেসে ওঠে সব ভাসিয়ে নিয়ে যাওয়া সিডর এর পানির তোড়,কানে আসতে থাকে আসমানী এর গলা, নাহ জ্ঞান হারানো চলবে না,কিছুতেই না।

এই বাংলাদেশে মহসিনদের কেউ উদ্ধার করে না,কেউ চিকিৎসা করায় না,কেউ বিশ্বাস করে না। মহসিনদের দল নেই,জাত নেই,পাত নেই তবু মহসিনেরা জেলে চালান হয় স্রোতের মতো,মহসিনদের উদ্ধার করার কেউ নেই।
মহসিনদের উকিল নেই,ক্ষমতা নেই,গদিতে বসার আকাঙ্খা নেই,পয়সা নেই,পয়সার কামনা নেই তবু কেন যেন এই বাংলাদেশে মহসিনেরা ভোগে। রাজায় রাজায় যুদ্ধ,উলুখাগড়ার প্রানান্ত।

শার্ট ছিঁড়ে পা বেঁধে ফেলে মহসিন,এইতো একটু ভালো লাগছে তার। সামনের দিকে এগিয়ে চলে মহসিন। কে জানে তার মতো আরো কত মহসিন চলছে হাতড়ে হাতড়ে,বেঁচে থাকতে,একটু ভালো থাকতে,ভাগ্য ফেরাতে।

( লেখাটি পুলিশী অত্যাচারে নির্মমভাবে পা হারানো লিমনকে উৎসর্গ করছি,লিমনের মতো কেউ অমানবতার ছাপ না বয়ে চলুক। সবাই বাঁচুক মানুষ হয়ে মানুষের মতো। )

Saturday, 11 August 2012


 মহুয়ার বনে সঙ্গম
- তাওসীফ হামীম ও শর্মী আমিন


মহুয়া বনে যাবে আমার সাথে?
কেড়ে নেব তোমার নগ্নতা আর লজ্জা
শীৎকারে শীৎকারে,শব্দের প্রতিধ্বনিতে বন উতলা হবে
উতলা হোক দুটি তনু

যদি শীতল চাঁদ নিজেকে লুকোয় মেঘের ঢালে
আলোতে বড্ড নির্লজ্জ লাগে

নির্লজ্জতাকে ঝেড়ে ফেলে ঝাঁপিয়ে পড় সেই আলোতে
কুরে কুরে খাও মেঘ মাখানো চাঁদের আলো
একদম শেষটুকু পর্জন্ত

মহুয়াতে আকন্ঠ নিমজ্জিত হব তবে
বাকিটুকু না হয় তুমি কোরো
ফেনিল জোছনা সূক্ষ্ম মশারি হয়ে আবৃত করবে নগ্ন দেহ

মশারীর সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম ফাকা ভেদ করে আমার কামনার জিহ্বা শুষে নেবে তোমার নারী সুলভ গন্ধ
ছড়িয়ে দেবে কামনার আবেশের এনথারক্স
তোমার শরীরের প্রতিটি কোষপ্রাচীর ভেদ করে পৌঁছে যেতে চাই গহীন থেকে গহীনে

উন্মুক্ত করে দিলাম নিজেকে
ব্রীড়ার ভাঁজ খুলে ডেকে নিলাম প্রবল পুরুষকে
মথিত আবেশে শিহরিত শরীর
নিষিদ্ধ প্রেমে উন্মত্ত যুগল

তোমার বুকের ঘামেও মৃগীর গন্ধের ছড়াছড়ি
সরু বাহুতে মরুভুমির মসৃণতা
কটিদেশে তোমার সমুদ্র ঢেউয়ের উদ্দমতা
এক ঝাপে হারিয়ে যেতে চাই

বুকে জমে থাকা ঘাম তুলে নেব শিকারী সাপের ন্যায়
আছড়ে পিছড়ে বেড়াবো তোমার উন্মুক্ত জমিনে
বিদগ্ধ কামনা হয়ে আশ্রয় খুঁজবো শিকারীর মত
দিন আর রাত এক হয়ে যাবে ভালবাসায়

শিশির বিন্দুর মতো ঘাম তোমার নাকের ডগায়
জানান দিচ্ছে রাগমোচনের প্রথম প্রহরের
আমার শরীরে তোমার পায়ের বন্ধন রাসায়নিক বন্ধনের মতো গড়ছে আর ভাঙছে
তীব্র পিস্টন সম হাঁপানির সাথে সাথে তোমার নিঃশ্বাস হয়েছে দ্রুত থেকে দ্রুততর

বুনো পুরুষ আজ ক্লান্ত ভীষণ
নোনা ঘামে চকচকে শরীর যেন বিজয়ীর আস্ফালন
রতিক্লান্ত মুখে সাফল্যের ছায়া
পেঁচিয়ে ধরে প্রকৃতির কটি,মুখ ডুবায় স্ফীত স্তনে

ডাঙায় তোলা মাছের মতো থর থর করে কাঁপা বুক তোমার
একটুকু মাথা রাখতেও ভয় লাগে ভীষণ,যদি আবার কাপন ধরে
যদি আবার প্রেমের নেশায় মত্ত হই যদি আবার তোমাকে ছিন্ন বিছিন্ন করার লোভ জাগে রক্তের কনায় কনায়?
কাঁপছে শরীর,কাঁপছে মন,উন্মত্ত অধরে অধর ডোবানোর আহবান
তীব্র তৃপ্তির বিজয় কেতন উড়িয়ে দুটো তনু এখন শান্ত আর একাকার।

Wednesday, 8 August 2012

অসম্ভব রূপবতী সুইডিশ ভূত


নাম এরিক হওয়াতে কিছু সুবিধা আমি অবশ্যই ভোগ করি, অনেক গল্প উপন্যাসের নায়কের নাম, উচ্চারনে সহজ, একটা আংরেজ ভাব, সম মিলিয়ে খারাপ না। বয়স বেশী না পঁচিশ। যদি চেহারার বর্ণনা দেই তাহলে একটু সমস্যা আছে। মেয়ে পাঠকরা, সাবধান!, প্রেমে পড়ে যেতে পারেন। তাও বলছি। উচ্চতায় আমি প্রায় ৬ ফুট। বলিষ্ঠ শরীর। মাথা ভর্তি চুল। একদম স্ট্রেইট কাঁধ পর্যন্ত নেমে গেছে। ডাগর ডাগর চোখ। মুখে ফ্রেঞ্চ কাট দাড়ি। এক কথায় সুদর্শন বলতে যা বোঝায় আমি তা। বাই প্রফেশন আমি ডক্টর। আমার পেশা ঠিক চেহারার সাথে যায় না। ডক্টরদের মধ্যে একটু আড়ষ্ট ভাব লক্ষণীয়। আমি তেমন না মোটেও। উদার, খোলামেলা, নারিসঙ্গ উপভোগ করি। জীবন নিয়ে নির্দিষ্ট কোন দর্শন ও নেই। দর্শন একটাই, মানুষের জীবন বাঁচাবো, দু হাতে কামাবো, আড়াই হাতে উড়াবো।

আমি ডাক্তারি পাস করেছি বেশী দিন হয় নি। প্র্যাকটিস শুরু করেছি একটা ক্লিনিকে। আপাতত আছি নিজের মতো করে। টুকটাক পড়াশুনা করছি। পোস্ট গ্রাজুয়েশন করার ইচ্ছে আছে। বিভিন্ন সেমিনার টেমিনার এটেন্ড করে বেড়াই এখন। আসলে এগুলো সব এক্সকিউজ। দেশ বিদেশে ঘোরাঘুরিই মূল লক্ষ্য। মোটামুটি এঞ্জয়েবল লাইফ বলা চলে। এবারের কিস্তিতে এসেছি উপসালা, সুইডেন। উপসালাতে চমৎকার একটা ইউনিভার্সিটি আছে। নাম উপসালা ইউনিভার্সিটি। বহু পুরাতন ইউনিভার্সিটি। এই ইউনিভার্সিটির স্টুডেন্ট ছিলেন ক্যারোলাস লিনিয়াস। জ্ঞানী মানুষ। শ্রেণীবিন্যাস বিদ্যার জনক। তো আমি এই ইউনিভার্সিটির স্কুল অব মেডিসিনের এক সেমিনারে এটেন্ড করবো। অনলাইনে সব ফর্মালিটিজ সেরে নির্দিষ্ট দিন ক্ষণে রওনা দিলাম সুইডেন। সুইডেন বলা ঠিক না। উপসালা বলা উচিত। স্টকহোম আমি আগেও এসেছে। এবারই প্রথম উপসালাতে। বলা হয় নি আমার বাড়ি কিন্তু নরওয়েতে। সুইডেনের প্রতিবেশী দেশ। আমাদের সব কিছু প্রায় কাছাকাছি ধরণের।

যেদিন উপসালায় পৌঁছলাম, ঘড়িতে দেখি সময় কম, বুঝলাম হোটেল খুঁজতে গেলে দেরী হয়ে যাবে। সরাসরি ট্যাক্সি নিয়ে সেমিনারে এটেন্ড করলাম। সেমিনার শেষে ক্লান্ত শরীর নিয়ে বের হলাম হল থেকে। এখন হোটেল খোঁজার পালা। ভার্সিটির কাউকে জিজ্ঞেস করলে হয়। ইচ্ছে করছে না। বেটার কোন ট্যাক্সি নিয়ে ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করা।

আমি একটা ট্যাক্সি নিলাম। ড্রাইভার আফ্রিকান। চেহারায় বোঝা যায়। আজকাল এশিয়া, আফ্রিকা থেকে প্রচুর মানুষ চলে আসছে ইউরোপে। জাতিগত ভিন্নতা থাকলেও মানিয়ে নিয়েছে বেশ। আমি হোটেল সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতেই চমৎকার ইংরেজি তে বলল কাছেই একটা হোটেল আছে। ক্লেরিওন হোটেল। আমাকে নিয়ে গেলো হোটেলে। আসলে হোটেলটা এতো কাছে ট্যাক্সি নেয়ার দরকার ছিল না হেঁটেই যাওয়া যেতো। হোটেলের আউটলুক ভালো। আমি ফর্মালিটিজ সেরে চেক ইন করলাম।

তিন তারা, চার তারা বা পাঁচ তারা যেকোন হোটেলের যে বিষয়টা আমার ভালো লাগে সেটা হোল নীচ তলার মনোরম অফিস আর প্রকৃতির ছাপ। এই হোটেলও তার ব্যতিক্রম নয়। একটা ক্যারিবিয়ান নারিকেল গাছ দেখা যাচ্ছে ঠিক মাঝখানে, এর পাশেই ছোট একটা পুল, আমি নিশ্চিত কাছে গেলে দেখা যাবে সেখানে কিছু মাছ সাতার কাটছে এবং অবধারিত ভাবে মাছের রং হবে নীল,গোলাপি এবং লাল। এছাড়াও দেখা যাচ্ছে ছোট ছোট সুন্দর করে ছাটা বুশ।

সেমিনার হোটেল করে আমার দু দিন কেটে গেলো উপসালায়। আসে পাশে তেমন কিছু দেখা হল না। কাছে একটা নদী আছে। নাম ফাইরিস। রুমের জানালা দিয়ে দেখা যায়। প্রশস্তে তেমন চওড়া না হলেও গোছানো টাইপ নদী। ইউরোপের প্রায় সব নদী গুলোই এমন দেখলেই মনে হয়। ক্যানভাস রঙ তুলি নিয়ে বসে যাই। শুনেছি কাছেই একটা চার্চ আছে। আমাদের এদিকের (স্কেন্ডিনেভিয়ান জোন) বিখ্যাত চার্চ। উপসালা ক্যাথেড্রাল। নরওয়ে ফিরবার আগে দেখে যাওয়ার প্ল্যান।

তৃতীয় দিনেও সেমিনার শেষ করে ক্লান্ত শরীর নিয়ে হোটেলে প্রবেশ করলাম। বাহিরের আবহাওয়া সুবিধের না। আকাশ জুড়ে মেঘ। যখন তখন জোরেশোরে বৃষ্টি নামবে। এরকম আবহাওয়া আমার আবার গান শুনতে ভালো লাগে।
হালকা পায়ে হেটে আমি ডেস্কে গেলাম। সুইডিশ রমনীরা অসম্ভব রূপবতী, যেমন এই ডেস্কের মেয়েটার কোকড়া চুল মেয়েটার রূপ সাধারনের থেকে একটু ভিন্ন করে ফেলেছে।
- গুড ইভনিং।
- গুড ইভনিং স্যার। আপনার দিন কেমন গিয়েছে?
- দিন তো সব সময় ক্লান্তই করে, সন্ধায় রুপবতী রমণী দর্শনে সেই ক্লান্তি দূর হয়।
- অনেক ধন্যবাদ স্যার। আপনি কি রাতে বাইরে খাবেন? নাকি আমাদের হোটেল লাউঞ্জ থেকে?
- রাত তো এখনও তরুনী, তরুনী রাতের মজা আধা পেটা থেকে, এখনো ঠিক করিনি কোথায় খাবো, আপনারা কটা নাগাদ খাবার সাপ্লাই করেন?
- স্যার ১০ টা। এই নিন আপনার রুমের চাবি।
- হাউ ক্যান আই গেট সাম সুইডিশ ক্লাসিক মিউজিক?
- পছন্দের শিল্পী এর নাম বললে আমরা রুমে তার মিউজিক সিডি পৌঁছে দেব।
- আই উইল কল ইউ দেন।
বা দিকে মোড় নিয়ে লিফট এর দিকে এগিয়ে গেলাম আমি,ঢুকে পড়লাম লিফটে। সাথে আরো আছেন দুজন ভদ্রলোক, আমি তাকিয়ে বিনয়ের হাসি দিলাম, হাসিতে সুইডিশ কালচার আর মানুষের প্রতি আমার ভক্তি আর ভালোবাসা মিশিয়ে দিলাম। দরজা বন্ধ হতেই আমি সোজা তিন চাপলাম। কয়েক সেকন্ড পরই তিন তলা।

নেমে ডান দিক থেকে ১৬ নাম্বার রুমটা আমার জন্য বরাদ্দ। হাটতে থাকলাম সেই দিকে,দুজন রুম সার্ভিস আমাকে অতিক্রম করার সময় মৃদু হাসি হেসে গেল,এর পর আর একজন আসলো সামনের দিক থেকে,এই রমণী আমার দিকে ভয়ঙ্কর শীতল চোখে তাকাল, আমিই চোখ নামিয়ে নিতে বাধ্য হলাম,বহুদিন এমন শীতল চোখ দেখিনি, মাছের মতো অপলক চাহনী। মাছ আর সাপ তাদের চোখ বন্ধ করতে পারে না, কারন তাদের চোখের পাতাই নেই,কিন্তু এই মেয়ের তো চোখের পাতা আছে, তার অপলক দৃষ্টি হবার কারন বুঝতে পারলাম না। আমি একবার পিছন ফিরে তাকালাম, সেই রমনীর র ও দেখা যাচ্ছে না, হুশ করে কোথায় গেল? আজিব তো! মাত্রই আমাকে পার করল রমণী, কোথায় গেল হুট করে? দুনিয়ার মানুষজন কি অনেক দ্রুতগামী হয়ে গেল নাকি আমিই কচ্ছপের মতো ধীরগতির হয়ে গেলাম? ছাইপাশ ভাবতে ভাবতে চাবি ঘুরিয়ে রুমে ঢুকলাম, বিছানার ধবধবে শাদা চাদর দেখে মনটা সিন্ধ হয়ে গেল, নরওয়ের বরফ ঢাকা ধু ধু প্রান্তর এর একটা আবেশ।
সোজা ফ্রিজ খুললাম, পৃথিবীর ৭০ ভাগ মানুষ ফ্রিজ খোলে কিছু পান করার জন্য আমিও তার বিপরীত নই, আপেল জুস নিলাম গ্লাসে আর একটা আভাগ্রাডো ফল, প্রচুর পটাশিয়াম সরবারহ করে এই ফল, কলা থেকে তিন গুন।

জানালার পর্দা খুলে বাইরে তাকালাম, সারি সারি গাড়ির লাইন রাস্তায়, ঘরে ফেরা মানুষের ব্যস্ততা। কেউ ফিরছে সন্তানের কাছে, কেউ মায়ের কাছে কেউবা প্রিয়তমার কাছে, সময় বড় দ্রুত গড়ায়। গড়ানো সময় নিয়ে রাশিয়ান শিল্পী দিদীউলিয়ার চমৎকার কিছু গান আছে, দেখা যাক একটা সিডি যোগাড় করা যায় কিনা ভাবতে ভাবতে ফিরে এলাম বিছানায়, এক পায়ের আঙ্গুলের সাহায্য নিয়ে অন্য পায়ের জুতো খুলে ফেললাম, গা এলিয়ে দিলাম বিছানায়, একটা গোসল নেয়া দরকার, শরীর টানছে কিন্তু মন টানছে না। মনের সাথে যুদ্ধ করে আর গোসলে যাওয়া হল না। শরীর এলিয়ে দিলাম বিছানায়।

ঘুম ভাঙ্গল কাফের খোচায়, মাথার নীচে হাত নিয়ে এসেছিলাম, কাফের খোচা লেগেছে চোখের পাশে। নাহ আর না, আর ঘুমালে রাতের খাবার মিস হয়ে যাবে, বাইরেও যেতে ইচ্ছে হচ্ছে না, এখনও মুজোও খোলা হয়নি। ইন্টারকমে নক করলাম
- রাতের খাবারের কি মেন্যু?
- মেইন কোর্স স্যার?
- হুম।
- মাটন কাটলেট, বিফ স্টেক, মেরিনেটেড ফিশ,টার্কি গ্রিল............
- হয়েছে হয়েছে, একটা ডাবল বিফ স্টেক, সল্ট, পিপার, স্পাইস সহ।
- স্যার আর কিছু?
- একটা সিঙ্গেল গ্রিক সালাদ, মাশরুমের ডাবল সুপ, খয়েরি পাউরুটী, আর সিঙ্গেল কেক, চিজ অথবা ফ্রুট আইদার উইল ডু।
- ১০ মিনিট পর পৌঁছে যাবে স্যার।

একটু শীত শীত লাগছে, কন্ডিশনারের তাপমাত্রা বাড়াতে বাড়াতে ভাবলাম আজ রাতে যদি গল্প করার কেউ থাকলে খুব জমত, সুইডেনে আজ শেষ দিন আমার। কাল চলে যাচ্ছি। দুপুরের দিকে।
দরজায় নকের শব্দ শুনেই চেচালাম, কাম ইননননন।

অবিশ্বাস অপেক্ষা করছিল আমার জন্য, সেই মেয়ে খাবার নিয়ে ঢুকল রুমে। সর্পচোখী রমণী। সোজা টেবিলে গিয়ে খাবার রাখলো। আমার সামনে এসে দাঁড়ালো ঠাণ্ডা গলায় বলল
-আপনার মুজা থেকে গন্ধ আসছে,আমার মুজার গন্ধ,রসুনের গন্ধ,মরিচের গন্ধ সহ্য হয়না। আপনার খাবার এনেছি মরিচ ছাড়া।
- ইয়ে মানে আমার গন্ধ আমার সহ্য হলেই তো হয়,আপনার সহ্য না হলে তো কিছু আসে যায় না,তাই না?
আপনার এইডস হয়েছে এই ঘোষণা দিয়ে রোগীর দিকে যেভাবে তাকানো দরকার সেইভাবে তাকালাম।
- আসে যায় কারন,আমি সারারাত এখানে থাকবো। আপনি গল্প করার জন্য কাউকে খুঁজছিলেন।
সারাজীবন মড়দেহ নিয়ে ঘাটাঘাটি করা আমার কলজে শুকিয়ে এল,এই মেয়ে কিভাবে জানলো আমি সারারাত গল্প করার মানুষ খুঁজেছি?
- ভয় নেই,আমি মানবী না আমি ভূত।
- হা হা হা,দারুন,অসম্ভব রূপবতী সুইডিশ ভূত? নাকি পিঙ্গলকেশী রুম সার্ভিস ভূত? না না,মুজোর গন্ধশোঁকা ভূত?
আমি হো হো করে হাসতে থাকলাম,ভাবটা এমন যেন দিন সেরা কৌতুক করে ফেলেছি,রমনীর মুখে কোন পরিবর্তন দেখতে পেলাম না। আমি একটু চিন্তিত হলাম।
- আপনাকে ধন্যবাদ,খাবার দিয়ে যাবার জন্য,এখন আসতে পারেন।
- আর যদি না যাই?
- ইন্টারকমে ফোন করব।
- করুন না।
ফোন তুলে কোন ডায়াল টোন শুনতে পেলাম না। এবারে আমার অবস্থা খারাপ। আমি সোজা সাপটা জিজ্ঞাসা করলাম,কি চান আপনি? সমস্যা কি আপনার? কি নাম আপনার?
- নাম ফিলিপা,কিছুই চাই না,কোন সমস্যাও নেই।
- আপনি আসলেই ভূত?
- জি আমি আসলেই ভূত,এই হোটেলেই আমার মৃত্যু হয়েছে। আগুনে পুড়ে,গত ৬ বছর আগে।
- ভূত আপনি খুবই ভালো কথা,এখন কি করতে চান?
- গল্প শুনতে চাই,গল্প শুনাতে চাই। আপনি খাওয়া শুরু করুন,খেতে খেতে গল্প করবো।
ভালোভাবেই কথা বলছে,ভূত হলেও নিরীহ ভূত,সমস্যা আপাতত নেই,না খেপে গেলেই হয় এখন।
- আপনিও আসুন,আমার সাথে বসে খান। আ ডিনার উইথ আ বিউটিফুল ঘোস্ট। হা হা হা
হাসিতে গড়াগড়ি দেবার ইমো দিলাম,ফিলিপা আমার দিকে শীতল ভাবে তাকিয়ে আছে,অপলক চোখে। আমি চুপ মেরে গেলাম।
- ভূতেরা খায় না,অথবা পান করে না এটা আপনি জানেন না?
- আমি ভূত সম্পর্কে খুবই কম জানি,আপনিই আমার জীবনে দেখা প্রথম ভূত,তাও আবার রূপবতী ভূত।
- আমি কেন এসেছি জানেন?
- কেন?
- আমার জীবনে দেখা শেষ মানুষটা আপনার মতো।
- মানে?
- যখন আগুন লাগে আমি তখন একটা রুম গোছাচ্ছিলাম,টের যখন পাই অনেক দেরি হয়ে গেছে, তখন আমি দৌড়ে লিফট এর দিকে যাই,লিফটে একজন পুরুষ ছিল, উনি অপেক্ষা না করে দরজা বন্ধ করে দেন,আমি ফিরে এসে সিঁড়ি ভেঙে নামার চেষ্টা করি,ততখনে আমার গায়ে আগুন লেগে গেছে,পা পিছলে সিঁড়ি থেকে পরে যাই,সেখানেও আগুন,আমি দিক খুজে পাইনি,কালো ধোয়াতে সব অন্ধকার। এরপর আর কিছুই মনে নেই। এখন এখানেই থাকি,মাঝে মাঝে যাদের পছন্দ হয়,এসে গল্প শুনিয়ে যাই।
- ভয়ঙ্কর। আসলেই ভয়ঙ্কর। ফায়ার সার্ভিস কি করেছে?
- আমার মৃত দেহ উদ্ধার করেছে।
- আমি এখন চলে যাবো। আপনি ঘুমিয়ে যান। আপনার সাথে গল্প করা শেষ।
- আচ্ছা দাঁড়ান,আপনাকে একটা জিনিস দেই।
আমি সুটকেস খুললাম,সেখান থেকে বের করলাম একটা এলব্যাম,ছবি রাখার এ্যালবাম,এয়ারপোর্ট থেকে কিনেছিলাম।
- এটা নিন,আমাদের পরিচয়ের স্মারক হয়ে থাকুক।
- আচ্ছা আমি যাই,আপনি ঘুমান।
আমি ইচ্ছা করেও চোখ মেলে রাখতে পারলাম না,ঘুমে ঢলে পড়লাম। ঘুম ভাঙল দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ শুনে।
দরজা খুলে দেখলাম রুম সার্ভিস,আবার খাবার হাতে দাঁড়ানো,হতভম্ব আমি খাবার হাতে নিয়ে দাড়িয়ে রইলাম,ফিলিপা যেখানে খাবার রেখেছিল সেখানে কিছুই নেই।

 আমি ল্যাপটপ অন করে ৬ বছর আগের সাল আর হোটেলের নাম লিখে সার্চ দিলাম,উত্তর এল আগুনে ৬ জনের মৃত্যু আর ১৩ জন দগ্ধ। আর আমার সুটকেসের এ্যালবামও নেই।

আপেল বিলাস


মাথার উপর খড়খড়ে রোদ,সূর্য ঠিক মাথার উপরে। রুমালে কপাল মুছে আসলাম তার সিটের নীচ থেকে পানির বোতল বের করে। ঢক ঢক করে পানি ঢালে গলায়। মাথাটা একটু ঠাণ্ডা হয়। সিএনজি অটোরিক্সাটা দাড়া করায় মহাখালী ফ্লাইওভার এর নীচে। ইঞ্জিন বন্ধ করে বাইরে বের হয় আসলাম। ভালো করে একটু শ্বাস নেবার চেষ্টা করে,শীশায় ভারি ঢাকার বাতা সেই সুযোগ দিতে চায় না।

চোখ পিট পিট করে তাকায় নিজের সিএনজি এর দিকে,গত ৪ বছর আগের কেনা,ফাতেমার সব সঞ্চয় আর নিজের সব সঞ্চয় ভেঙে কেনা। কেনার পর ঘর ভাড়া বাকি পড়েছিল প্রায় ৫ মাসের,ফাতেমা হাতে পায়ে ধরে ৫ মাস থেকেছে সেই বাড়িতে। ফাতেমার মতো একজন স্ত্রী থাকা আসলে ভাগ্যের ব্যপার,মনে মনে ভাবে আসলাম।

এক রুমের একটা ছাপরা ঘর,একটা সিএনজি, আর গার্মেন্টস কোম্পানিতে ফাতেমার চাকরি এই নিয়েই আসলামের সংসার। সেই কলেজ পড়ার সময় গ্রাম ছেড়েছিল আসলাম,সাথে ছিল ফাতেমা। লঞ্চ থেকে নেমেই সদর ঘাট,শহরে পৌছাতে পৌছাতে হারিয়েছিল ব্যাগ আর টাকা। ফাতিমার বয়সের একটা মেয়ে উড়ে বেড়ায়, বান্ধবীদের সাথে আড্ডা দেয়,জন্মদিন পালন করে,ভার্সিটি যায় এগুলো আসলাম জানে,অনেক সময় দল বেধে মেয়েরা ওঠে আসলামের সিএনজিতে। আসলামের তখন মনে পড়ে নিজের স্ত্রী এর কথা। তবে হ্যাঁ,ফাতিমাকে অনেক রঙের মাঝে না রাখতে পারলেও কখনও পথভ্রস্ট্র হয়নি আসলাম, বস্তির আশে পাশে বাসার অন্য পুরুষের মতো ফাতিমার গায়ে হাত তোলেনি কোনদিন,বেশ্যাপাড়ার দিকে চোখ তুলেও তাকায়নি। ভালবেসেছে আসলাম সবটুকু দিয়ে।

-সিএনজি যাবা?
- কই?
- টঙ্গি বাজার?
- জি না।
-আরে চল, মিটারের থেকে বেশি দিমু
-না,ভাই। আমার অন্য দিকে যেতে হবে।

প্লানটা ততক্ষনে মাথার মধ্যে গেঁড়ে বসেছে আসলামের। দশ পা হাঁটলেই ফলের দোকান। সেখানে পৌছাল আসলাম।

- ভাই আপেলের কেজি কত?
- কত কেজি লাগবে আপনার?
- খুচরা দুইটা লাগতো।
- খুচরা তো বেচি না,ভাই।
- আরে ভাই দেন না। ফাও তো নিতেছি না।
- আচ্ছা ২০ টাকা দেন।
দুটো আপেল একটা কাগজের ব্যাগে পুরে সিএনজি এর কাছে ফিরে আসে আসলাম। ইঞ্জিন চালু করতেই এক মেয়ে এসে দাঁড়াল
- ভাই যাবেন?
- কোথায়?
- মধ্য বাড্ডা।
-জী যাবো
- কত?
- আপনার যা ইচ্ছা হয় দিয়েন,আপনি তো যান সবসময়।

পাক্কা ড্রাইভারের মতো বড় বড় বাস ট্রাকের ফাঁকা দিয়ে সিএনজি চালিয়ে মহাখালির জ্যাম পার করে আসে আসলাম। ঘণ্টা খানেক পর মেরুল বাড্ডার রাস্তায় চলে আসে আসলাম। সেখানে সিনেমা হলের বড় একটা হোরডিং, জসিম- শাবানার কালিয়া ছবির। জসিমের গোফটা বড্ড ভালো লাগে আসলামের।
মধ্য বাড্ডার রাস্তায় চলে আসে আসলাম। মসজিদের সামনে দাড়াতে বলে মেয়েটা। ব্যাগ থেকে বের করে দেয় একটা ১০০ টাকার নোট আর খুচরা ১০ টাকা।

গাড়ি ঘুরিয়ে মেরুল বাড্ডার রাস্তায় চলে আসে আসলাম,এখন আর কোন খেপ মারবে না সে। গাড়ি পার্ক করে গলির মধ্যে,ওইতো দেখা যায় ফাতেমার গার্মেন্টস। দুপুরের খাবারের সময় দিয়েছে,সব মেয়েরা বের হয়ে আসছে,কারো হাতে বাটি,কারো হাতে ছোট টিফিন ক্যারিয়ার। ফাতেমাও বাসা থেকে খাবার নিয়ে আসে বাটিতে করে। সিঁড়ি ভেঙে দোতালায় আসে আসলাম,ডান দিকের রুমেই মেয়েরা বসে,ঢুকতেই ফাতেমাকে দেখতে পায় সে। ফাতেমার চোখে অবিশ্বাস দেখতে পায় আসলাম

- আপনি এইখানে কি করেন?
- তোমারে দেখতে আসলাম।
- খেপ নাই আপনার?
- এই দিকেই আসছিলাম,চিন্তা করলাম তোমারে দেইখা যাই,খুব দেখতে ইচ্ছা করছিল।
কাগজে মোড়ানো আপেল দেয় আসলাম ফাতেমার হাতে।
- খাবার পড়ে খাইয়। আমি তাইলে এখন যাই।
- কই যান আপনি,শেষ মাথায় বাথরুম,হাত ধুয়ে আসেন,ভাত খাবেন।
- ভাত তো একজনের,দুই জন মানুষ কেমনে খামু?
- আপনি যান তো,হাত ধুয়ে আসেন।
হাত ধুয়ে ফিরে এসে আসলাম দেখে,দুই বাটিতে ভাত বেটে বসে আছে ফাতেমা। বিছানো খবরের কাগজ এর উপর বসে আসলাম।
- আগে মাছ দিয়া খান,শেষ হইলে ডাইল নিবেন।
- আচ্ছা।

হাতে ভাত মাখতে থাকে আসলাম,মাছ আর আলুর ঝোল,সাথে একটা কাচা মরিচ,সামনে একটা ছোট কাগজে লবন। আস্তে আস্তে খাওয়া শুরু করে আসলাম। ফাতেমা এটা সেটা জিজ্ঞাসা করে,আসলাম উত্তর দেয়।
- ভাত কই পাইলা ফাতেমা?
- একজনের কাছ থেকে চাইয়া নিছি,অল্প একটু।
প্লেট উঠিয়ে চুমুক দিয়ে ডাল খেয়ে,উঠে পরে আসলাম। হাত ধুয়ে আসে। ফাতেমা তখনও বসে আছে,বড্ড আস্তে আস্তে খায় ফাতেমা।
- আমি গেলাম,নীচে গাড়ি রাইখা আইছি।
- একটা আপেল নেন,দুইটা দিয়া আমি কি করমু?
- তোমার কাম কখন শেষ হইব আজকে?
- ৫ টার সময়।
- আইচ্ছা তাইলে,নীচে দাঁড়াইয়ো তুমি,আমি আসমুনে তোমারে নিতে।
- কেন? আমি তো একলাই বাসায় যাই,আপনার আসার কি দরকার?
- কালিয়া ছবি দেখমু আইজকার আমরা, জসিম –শাবানার। থাইকো নীচে।

সিঁড়ি ভেঙে নীচে নামতে থাকে আসলাম,পিছনে ফিরে তাকায় না একবারও। তাকালে হয়ত আসলাম দেখত,ফাতিমার চোখে চোখে জল,দু ফোটা ভালোবাসার জল।

Tuesday, 7 August 2012

৭১ এর জেনোসাইড (নিক্সন-কিসিঞ্জার)


বটমলেস বাকেট অর্থাৎ তলাবিহীন ঝুড়ি খ্যাত হেনরি কিসিঞ্জারের সেই বিখ্যাত উক্তি কম বেশি আমরা সবাই শুনেছি।

আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বিদেশী বন্ধুদের কথা(তালিকা দেবার প্রয়োজন বোধ করছি না) আমরা সব সময় হৃদয়ে রাখবো। কিন্তু একজন বিদেশী যুদ্ধাপরাধীর কথা না বলে আর পারছি না, মানবতা পায়ে ঠেলার মতো উপমা শুনেছি,হেনরি কিসিঞ্জারের কথা জেনে উদাহরণ জানার বিলাসিতাও হয়েছে।

ব্যবচ্ছেদ করলে একটা সহজ সমীকরণে আসা যায় খুব সহজে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিগুলো ছিল,ভারত,তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং ব্রিটেন। আর ঘোরতর বিরোধী ছিল যুক্তরাষ্ট্র,চীন এবং সৌদি আরব। ইতিহাস এবং দলিল এদের প্রমাণ দেবে।

আমেরিকার কেন্দ্রীয় প্রশাসন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সূচনা লগ্নেই পাকিস্তানের সপক্ষে তার নীতি ঘোষণা করে। তারা গণতন্ত্রকামী বাংলাদেশের জনগণের সমর্থনে এগিয়ে আসেনি। তারা দাঁড়িয়েছে পাকিস্তানের অখণ্ডতার নামে স্বৈরাচারী সামরিক জান্তা অগণতান্ত্রিক শক্তির সপক্ষে। তখন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ছিলেন রিচার্ড এম. নিক্সন এবং হেনরি কিসিঞ্জার ছিলেন নিক্সনের একান্ত আস্থাভাজন ব্যক্তি, যিনি তখন আমেরিকার জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ক প্রেসিডেন্টের একান্ত সহকারী।

এই নিক্সন-কিসিঞ্জার নিয়ন্ত্রিত মার্কিন নীতিই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে পরিচালিত হয়। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় আমেরিকা পাকিস্তানের এমন একটি অত্যাচারী সরকারের সপক্ষে দাঁড়াল যে সরকার তার পূর্বাঞ্চলের নিরীহ জনগণের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। পাকিস্তানের পক্ষে নিক্সন-কিসিঞ্জারের প্রকাশ্য সমর্থন কিংবা পাকিস্তানের প্রতি ঝুঁকে পড়া নীতি অনুসরণ নিছক পক্ষপাতিত্বমূলক ভূমিকা ছিল না। তখনকার মার্কিন প্রশাসনের নীতি এমন এক পর্যায়ে উপনীত হয়, যা ঐ ঝুঁকে পড়ার সীমা ছাড়িয়ে যায়। বলা যায়, প্রায় অনেকটা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে তথা পাকিস্তানের সপক্ষে আমেরিকার প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ কিংবা মদদদান। আমেরিকা ঐ অবস্থান গ্রহণ করার কারণে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বানচাল করতে পাকিস্তানকে সামরিক ও নৈতিক সমর্থন জানায়।

পাকিস্তানের পক্ষে নিক্সন প্রশাসনের ঝুঁকে পড়ার নীতির এক বলিষ্ঠ প্রয়োগকারী ব্যক্তি হচ্ছেন- হেনরি কিসিঞ্জার, যিনি তখন বাংলাদেশের ব্যাপারে প্রেসিডেন্টের যে কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণে অত্যন্ত আগ্রহী ও পারদর্শী। কিসিঞ্জার তাঁর নিজের উচ্চতর ক্ষমতা ও যোগ্যতার অধিকারী হয়ে এবং প্রেসিডেন্ট নিক্সনের সাথে তাঁর ব্যক্তিগত সমীকরণের বলে তিনি এমনই একজন শক্তিশালী ব্যক্তিতে পরিণত হন যার ফলে তিনি বাংলাদেশের ব্যাপারে মার্কিন নীতি প্রণয়নের কেন্দ্রীয় চরিত্রে আবির্ভূত হন।

নিক্সন-কিসিঞ্জার ছিলেন একাত্তর সালের বাংলাদেশ বিষয়ে আমেরিকার নীতি নির্ধারণে কর্তৃত্বপ্রাপ্ত দুজন প্রভাবশালী ব্যক্তি। তাঁরা গোপনে সকল সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন। যুদ্ধের ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও তারাই ১৯৭১ সালের ৯ ডিসেম্বর আমেরিকার সপ্তম নৌ-বহর বঙ্গোপসাগরে মোতায়েনের নির্দেশ দেন, যার মূল লক্ষ্য ছিল ভারত এবং সোভিয়েত ইউনিয়নকে সর্বোচ্চ ভীতিপ্রদান এবং পূর্ববাংলা থেকে সরে আসতে পাকিস্তান যেন কিছু সময় পায়।

এ ছাড়াও ব্লাড টেলিগ্রাম এর কথা বলতে হয়। আর্চার কেন্ট ব্লাড একজন মার্কিন নাগরিক যিনি ১৯৭১-এ বাংলাদেমে মার্কিন কনসাল জেনারেল হিসাবে কর্মরত ছিলেন এবং মুক্তিযোদ্ধাদের সমর্থন দিয়েছলেন। নিক্সন-কিসিঞ্জারের পাকিস্তানপন্থী অন্যায় নীতির বিরুদ্ধে সক্রিয় ভূমিকার জন্য তাকেঁ “বাংলাদেশের যুদ্ধবিবেক” হিসাবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। সর্বপ্রথম তিনি ঢাকায় এসেছিলেন ১৯৬০ খ্রিস্টাব্দে, পূর্ব পাকিস্তানস্থ মার্কিন দূতাবাসে পলিটিক্যাল কর্মকর্তার দায়িত্ব নিয়ে। আর্চার ব্লাড তাঁর দ্য ক্রুয়েল বার্থ অব বাংলাদেশ বইয়ের সূচনায় লেখেন, ‘একাত্তর নিয়ে লিখতে বসে আমার চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরছে। কারণ আমার বহু বন্ধুর মুখ ভেসে উঠছে, যারা শহীদ হয়েছে।

২৫ মার্চ মধ্যরাতে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী ঢাকা শহরে গণহত্যা শুরু করে। ৬ এপ্রিল ১৯৭১ ঐতিহাসিক মার্কিন দূতাবাস থেকে একটি তারবার্তা পাঠানো হয়েছিল ওয়াশিংটনে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরে। ঢাকায় কর্মরত মার্কিন কর্মকর্তারা ২৫ শে মার্চের ‘কলঙ্কিত রাতের’ গণহত্যা এবং সে বিষয়ে নিক্সন-কিসিঞ্জারের অন্ধ ইয়াহিয়া-ঘেঁষা নীতির প্রতিবাদ জানাতে সংকল্পবদ্ধ হয়েছিলেন।

তাঁরা খুব ভেবেচিন্তে একটি তারবার্তা লিখেছিলেন যাতে স্বাক্ষর করেছিলেন ব্লাড ও তাঁর ২০ জন সমর্থক সহকর্মী। তাঁরা তাতে ঢাকায় ইয়াহিয়ার গণহত্যার প্রতি ওয়াশিংটনের অব্যাহত নীরবতার নিন্দা করেছিলেন। ব্লাড তাতে কেবল স্বাক্ষরই দেন নি, বাড়তি এক ব্যক্তিগত নোটও লিখেছিলেন। এতে তিনি রিখেছিলেন, “আমি বিশ্বাস করি, পূর্ব পাকিস্তানে এখন যে সংগ্রাম চলছে, তার সম্ভাব্য যৌক্তিক পরিণতি হলো বাঙালিদের বিজয় এবং এর পরিণতিতে একটি স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা।“ এই ‘ব্লাড টেলিগ্রাম’ বস্তুত তখনকার নিক্সন-কিসিঞ্জারের দুর্গে বোমা ফেলেছিল। ‘’দ্য ট্রায়াল অব হেনরি কিসিঞ্জার’’ নামীয় গ্রন্থের লেখক ক্রিস্টোফার হিচেন্স মতে ‘মার্কিন ইতিহাসে ব্লাড টেলিগ্রামের কোনো তুলনা নেই।’ কিসিঞ্জার এ জন্য ব্লাডকে নির্বাসন দণ্ড দিয়েছিলেন।

ক্রিস্টফার হিচেন্স তার দি ট্রায়াল অফ হেনরি কিসিঞ্জার বইয়ের একটি পর্বে বাংলাদেশ,৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযুদ্ধ পরিবর্তী কিসিঞ্জারের ভূমিকা সম্পর্কে লেখেন।
আর একটি কথা না বললেই নয়,কিসিঞ্জার শুধু বাংলাদেশ জেনোসাইড নয়, পৃথিবীর আরও বেশ কয়েকটি দেশের মানবতাবিরোধী কর্মকান্ডে তার যোগ থাকার বিষয় নিশ্চিত করা হয়।

হিচেন্স এর বইটির যে পর্বে বাংলাদেশ কথা ও কিসিঞ্জারের কথা উল্লেখ রয়েছে সে পর্বটি অনুবাদ করছি।
অনুচ্ছেদ- বাংলাদেশ

পৃষ্ঠা-৪৪

১৯৭১ সাল গণহত্যা শব্দটি বিশ্বের দরবারে খুব পরিচিত করে তোলে!! ততকালীন সময়ে পাকিস্তানের ‘বাঙ্গালী’ জনগোষ্ঠির, তথা বাংলাদেশীদের পক্ষে ইউনাইটেড স্টেট কনসিউলেট তাদের স্টেট ডিপার্টমেন্টে একটি বার্তা পাঠায়। বার্তাটি পাঠানো হয় ৬ এপ্রিল ১৯৭১, যেখানে প্রধান স্বাক্ষরকারী ছিলেন তৎকালীন ঢাকার কনাস্যিউল জেনারেল আর্চার ব্লাড। অন্য অর্থে এটাকে হয়ত ব্লাড টেলিগ্রামও বলা যেতে পারে! মার্গেন্থাসের বিবরনী থেকে ভিন্ন এই বার্তাটি সরাসরি ওয়াশিংটনে পাঠানো হয়, যেখানে গনহত্যার বিষদ বর্ণনার চেয়ে গণহত্যা সম্পর্কে আমেরিকার সরকারের ভূমিকা নিয়ে বেশি সমালোচনা করা হয়। এর মূল বক্তব্য ছিলঃ
‘আমাদের সরকার গণতন্ত্র বিরোধী কাজের বিরুদ্ধে নিজেদের অবস্থান রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। আমাদের সরকার গণহত্যার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে ব্যর্থ হয়েছে। এই সরকার সাধারণ জনগনের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে, ব্যর্থ হয়েছে পশ্চিম পাকিস্থানী শাসক গোষ্ঠিকে নিয়ন্ত্রন করতে , এমনকি বিশ্বের দরবারে তাদের আসল রূপ প্রকাশেও তারা সক্ষম হয়নি যা কিনা অন্যান্য দেশের সাথে তাদের পারস্পরিক সম্পর্কের উপর প্রভাব ফেলতে পারে। মূল্যবোধের চরম অবক্ষয়ের সাক্ষী আমাদের সরকার, আর হাস্যকরভাবে ঠিক একই সময় তারা গনতনত্রের ব্যাখ্যা দিয়ে রাষ্ট্রপতি ইয়াহিয়া খানের কাছে একটি বার্তা পাঠায়, যেখানে পূর্ব পাকিস্থানের প্রবল জনপ্রিয় এবং সংখ্যা গরিষ্ঠ ভাবে বিজয়ী নেতাকে আটকের প্রতিবাদ করা হয়। সেই সাথে এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ বন্ধের আহবানও জানান হয়……… কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমরা নিরব দর্শকের ভূমিকা নেই- এমনকি মানবিক দিক থেকেও। এটি একটি দেশের অভ্যন্তরীন বিষয় বলে আমরা স্রেফ মুখ বুজে রইলাম যা একসময় গনহত্যায় রূপ নিল! সাধারন আমেরিকানরা এখন এর প্রতিবাদ করছে, সিভিল সার্ভেন্ট হিসেবে আমরাও সরকারের এই নিরবতাকে সমর্থন করি না, বরং আশা করছি সরকার এক্ষেত্রে যথাযথ ভূমিকা রেখে আমাদের গণতান্ত্রিক রাজনীতির একটি নতুন দিগন্তের সূচনা করবে।‘
এই বার্তাটিতে তৎকালীন বাংলাদেশে বসবাসরত বিশ জন আমেরিকান কূটনৈতিকের সাক্ষর করেন, পরবর্তীতে স্টেট ডিপার্টমেন্টে আসার পর আরো নয় জন কর্মকর্তা এতে একাত্নতা প্রকাশ করে সাক্ষর করেন। স্টেট ডিপার্টমেন্টের পক্ষ থেকে আমাদের স্বাধিনতার স্বপক্ষে এটাই সবচেয়ে জননন্দিত এবং শক্তিশালী বক্তব্য ছিল।
২৫শে মার্চ পাকিস্তান সেনাবাহিনী তৎকালীন রাজধানী ঢাকা আক্রমন করে,এবং শেখ মুজিবর রহমান কে অপহরন করে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যায়। যার মূল উদ্দেশ্য ছিল মুজিব অনুসারি এবং সাধারন জনতাকে লক্ষ্যহীন করা। সমস্ত বিদেশী মিডিয়াকে ঢাকা থেকে জোর পূর্বক বের করে দেয়া হয়,ততকালীন ম্যাসাকারের সরাসরি প্রমান পাওয়া যাবে,মার্কিন রেডিও থেকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রচারকৃত বার্তা সমুহে। আর্চার ব্লাড নিজে সরাসরি একটি বার্তা তখন কিসিঞ্জারের অধিকৃত জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদে পাঠান।
সেনাবাহিনীর সৈনিকেরা তখন সাধারন মানুষের বাড়িতে আগুন দেয়া শুরু করে,এবং মানুষগুলোকে গুলি করে হত্যা করে।( এই বন্দুকগুলো যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক এসিসটান্ট প্রোগ্রামের অন্তর্ভুক্ত ছিল)
এই সময় লন্ডন টাইমস এবং সানডে টাইমস যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করে,এন্থনি মাসকারহেনাস এর সেই প্রতিবেদন গুলো তারা সারা পৃথিবীর মানুষের জন্য প্রচার করে কালো রাতের মুখোশ উম্মোচন করে। খুন,ধর্ষণ,এবং সাধারন মানুষের উপর অত্যাচারের সেই রিপোর্টগুলো মানুষকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। শিশু ও নারী হত্যা করে সেনাবাহিনী তখন সাধারন মানুষকে দমিয়ে রাখতে চেয়েছিল।
প্রথম ৩ দিনে ১০ হাজার বেসামরিক মানুষকে হত্যা করা যায়,পরের কয়েকদিনের হিসাবে যা মিলিওন এর হিসাবে গিয়ে ঠেকে।
সকল হিন্দু ধর্মালম্বী জনগন তখন বাস করছিলেন একটি নারকীয় পৃথিবীতে।
প্রায় ১০ মিলিওন উদ্বাস্তু মানুষ তখন ভারত সীমানা পথে যাত্রা শুরু করে।
পুরো জেনসাইড কে তিনটি পয়েন্টে বর্ণনা করা যায়
১) সাধারন নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে জটিলতার অবতারনা।
২) পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে একটি আগ্রাসি সিধান্তের উদাহরন।
৩) সল্প সময়ের মধ্যে একটি আন্তর্জাতিক ক্রাইসীস সৃষ্টি।
নিউ দিল্লিতে অবস্থান রত তৎকালীন মার্কিন কূটনিতিক কেনেথ কেটিং বাংলাদেশের সাধারন মানুষের পক্ষে অবস্থান নেন। তিনি ছিলেন সাবেক নিউ ইয়র্ক সিনেটর, তিনি ২৯ মার্চ মার্কিন প্রশাসনকে বলেন “ “promptly, publicly, and prominently deplore this brutality” এছাড়াও তিনি এই বর্বর অপারেশন অবিলম্বে বন্ধ করতে প্রশাসনকে সতর্ক করে দেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেন “ “prior to inevitable and imminent emergence of horrible truths.”

নিক্সন ও কিসিঞ্জার এই বার্তার পরিপ্রেক্ষিতে অতি দ্রুত পদক্ষেপ নেন,আর্চার ব্লাডকে তার পদ ঠেকে অব্যাহতি দেয়া হয়,আর কেটিং কে বলা হয় যাতে তিনি তার ভারত ঘেঁষা আচরন শুধরে নেন। তাকে সরাসরি বলা হয় “taken over by the Indians.”

এপ্রিল মাসের শেষ দিকে,ঠিক যখন গনহত্যার হার সব ঠেকে উচু,হেনরি কিসিঞ্জার ইয়াহিয়া খানকে একটি বার্তা পাঠান,যেখানে কিসিঞ্জার ইয়াহিয়াকে তার সময়োপযোগী সাহসী সিধান্ত ও কূটনীতির ভূয়সী প্রশংসা করেন।

নিক্সন- কিসিঞ্জারের এই পাকিস্তান প্রশাসন ঘেঁষা মনোভাব,ও সেনাবাহিনীর যুদ্ধ অপরাধ সমর্থনের কারণ খুজতে গেলে আরও একটি বিষয় উঠে আসে।
কেন নিক্সন- কিসিঞ্জার জেনারেল ইয়াহিয়াকে সমর্থন জানিয়েছিল?
এপ্রিল মাসে যুক্তরাষ্ট্রের টেবিল টেনিস দলকে চীনের বেইজিং এ একটি ট্যুরনামেন্ট খেলতে আমন্ত্রন জানানো হয়,মাধ্যম হিসেবে ব্যাবহার করা হয় পাকিস্তানের তৎকালীন রাষ্ট্রদূতকে। এবং সেই রাষ্ট্রদূত টেবিল টেনিস খেলার আমন্ত্রন পত্রের সাথে চীন প্রশাসনের পক্ষ থেকে পাকিস্তানকে সাহায্য করার জন্য একটি নৌ বহর পাঠানোর সুপারিশ নিয়ে আসেন। নিক্সন- কিসিঞ্জার আন্তর্জাতিক রাজনীতির দখল নিতে মিত্র পক্ষের সমর্থন পাবার নিমিত্তে,লাখ লাখ মৃত্যুগামী জনগণকে জেনে শুনে আগুনে ফেলেছেন,নীরবে সমর্থন দিয়ে গেছেন সেই সেনাবাহিনীর অপারেশনকে। কি নির্মম,বর্বর ক্ষমতালোভী দুজন রাজনীতিবিদ।

পৃষ্ঠা – ৫০

যুদ্ধকালীন বাংলাদেশের সংকটময় পরিস্থিতিতে তার বিতর্কিত ভুমিকা নিয়ে কিসিঞ্জারকে সাংবাদিকদের বেশকিছু বিব্রতকর এবং বিদ্রুপাত্মক প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়েছিল,যা তার আনন্দঘন চীন ভ্রমনের অনেকটাই ম্লান করে দেয়।তিনি বাংলাদেশের জনগণ এবং নেতাদের প্রতি তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন,এবং শেখ মুজিবকে তিনি(তার তৎকালীন সহকারী রজার মরিস এর ভাষ্যমতে) Salvador Allende এর সাথে তুলনা করেন।

১৯৭৩ সালে কিসিঞ্জার সেক্রেটারি অব স্টেট হওয়া মাত্রই,গনহত্যার প্রতিবাদে যোগদানকারী প্রত্যেকেই তার তীব্র রোষের সম্মুখীন হয়।

১৯৭৪ এর নভেম্বরে কিসিঞ্জার একটি সংক্ষিপ্ত এবং দায়সারা উপমহাদেশ সফরকালে বাংলাদেশে আটঘন্টার একটি যাত্রাবিরতি নেন,এবং তিন মিনিটের একটি সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য প্রদান করেন। সেখানে ১৯৭১ সালে বঙ্গোপসাগরে তিনি কেন নৌ-বহর পাঠিয়েছিলেন জানতে চাওয়া হলে,তিনি উত্তর দিতে অসম্মতি জ্ঞাপন করেন।তার ফিরে যাবার তিন সপ্তাহের মধ্যে, এখন আমরা জানি,ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের একাংশ বাংলাদেশি সামরিক কর্মকর্তাদের একটি দলের সাথে গোপন সাক্ষাৎ শুরু করে,যারা মুজিবের বিরুদ্ধে একটি অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা করছিল। ১৯৭৫ সালের ১৪ই আগস্ট,মুজিব এবং তার পরিবারের ৪০ জন সদস্য একটি সামরিক হামলায় নিহত হন।এর কয়েকমাস পরে,তার কিছু নিকটতম রাজনৈতিক সহকর্মীদেরও কারাবন্দী অবস্থায় নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।